
নিজস্ব প্রতিবেদন:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত এই মন্ত্রিসভায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাব্য তালিকায় আলোচনায় ছিলেন নরসিংদী-১ আসনের সংসদ সদস্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই। তারপরও তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সংসদের মহিলা সংরক্ষিত আসনের এমপি পদের জন্য দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন শিরিন সুলতানা।
দলীয় একাধিক সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খোকন ও তার স্ত্রী, বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানার বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগ এবং দুই ছাত্রদল নেতার আলোচিত হত্যা মামলা—মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৩ সালের মে মাসের ছাত্রদল নেতা হত্যা মামলা বদলে দেয় সমীকরণ । নরসিংদী জেলা ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর শুরু হয় তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল। পদবঞ্চিত নেতাদের অভিযোগ—অযোগ্যদের অর্থের বিনিময়ে পদ দেওয়া হয়েছে। ২৫ মে ২০২৩, চিনিশপুর এলাকায় মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার সময় গুলিতে নিহত হন ছাত্রদল নেতা সাদেকুর রহমান ও আশরাফুল ইসলাম। ঘটনার পর সাদেকুরের ভাই বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় খায়রুল কবির খোকন ও শিরিন সুলতানাকে ‘হুকুমের আসামি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মামলায় আরও ৩০ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ৩০-৪০ জনকে আসামি করা হয়। তবে আইনি লড়াইয়ে তারা উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নেন। বর্তমানে মামলাটি বিচারাধীন।
আইনজীবী মহলের ভাষ্য মতে, মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এমন একটি বিচারাধীন হত্যা মামলা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়। “পদ বাণিজ্য” ও চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু হত্যা মামলা নয়, ২০২৪-২৫ সালে স্থানীয় পর্যায়ে খোকন-শিরিন দম্পতির বিরুদ্ধে ওঠে একাধিক অভিযোগ—ছাত্রদল ও যুবদলের পদ বাণিজ্যে চাঁদাবাজি।
দলীয় ভিন্নমত দমনে মামলা ব্যবহার প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা পদবঞ্চিত কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, “টাকা ছাড়া জেলা রাজনীতিতে পদ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।”তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
নরসিংদীতে এই ‘দম্পতি প্রভাব’ স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ছিল একচ্ছত্র। এমনটাই দাবি স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে শিরিন সুলতানার সাংগঠনিক যোগাযোগ ছিল শক্তিশালী। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের একটি অংশের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “নরসিংদী ছাত্রদল” বা “খোকন-শিরিন দুর্নীতি” লিখে খোঁজ করলে বহু ভিডিও ও পোস্ট পাওয়া যায়। তবে ডিজিটাল কনটেন্ট আইনি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে সুনির্দিষ্ট যাচাই প্রয়োজন—বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
খায়রুল কবির খোকন ও শিরিন সুলতানা বরাবরই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও দলের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে। তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, নরসিংদীতে সাংগঠনিক শক্ত অবস্থানের কারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
তাছাড়া দলীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না থাকলেও বিশ্লেষকদের মতে, বিচারাধীন হত্যা মামলা ও বিতর্কিত অভিযোগের ভার—নতুন সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারত। ফলে শেষ পর্যন্ত ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় জায়গা হয়নি খোকনের।
নরসিংদীর রাজনীতিতে খোকন-শিরিন দম্পতির প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে চলমান মামলা ও বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। হত্যা মামলার বিচারিক অগ্রগতি এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন—দুটিই নির্ধারণ করবে, এই দম্পতি আবারও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বলয়ে ফিরতে পারবেন কি না।