নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতের এক বিচিত্র ও ভয়াবহ উপাখ্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন খোকন মাহমুদ নির্ঝর। নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার এক নিভৃত গ্রাম থেকে উঠে আসা এই ব্যক্তির জীবনকাহিনি যেন কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের খলনায়কের চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। তবে এটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া পচনকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। রাজনীতির পবিত্র আঙিনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কীভাবে একজন অতি সাধারণ মানুষ থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় এবং কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি জনপদকে জিম্মি করে রাখা যায়, খোকন মাহমুদ নির্ঝর তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
খোকন মাহমুদ নির্ঝরের এই যে অবিশ্বাস্য ও রুদ্ধশ্বাস উত্থান, তার মূলে ছিল এক সুপরিকল্পিত অপরাধী মনস্তত্ত্ব। রাজধানীর ফুটপাতে বা ছোট দোকানে ব্যাগ বিক্রির মাধ্যমে যার জীবিকা শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল লুণ্ঠনকারী সত্তা। দেশের মানুষের আবেগ ও স্বপ্নের প্রকল্প পদ্মা সেতুকে পুঁজি করে তিনি যে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিলেন, তা ছিল তার অপরাধ জগতের হাতেখড়ি। শত শত বেকার যুবকের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া—এটি কেবল একটি আর্থিক অপরাধ নয়, বরং এটি ছিল অগণিত পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের কারণ। এই প্রারম্ভিক মূলধনই তাকে অপরাধের বৃহত্তর ময়দানে নামার সাহস জুগিয়েছিল। প্রতারণার টাকায় কেনা রাজনৈতিক পদবী তাকে এক ধরনের আইনি দায়মুক্তির নিশ্চয়তা দিয়েছিল, যা আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক বড় ট্র্যাজেডি।
২০১৮ সালের পরবর্তী সময়ে বেলাবোর রাজনীতিতে তার আকস্মিক ও মারমুখী পদচারণা সাধারণ মানুষের মনে বিস্ময় ও আতঙ্ক উভয়ই সৃষ্টি করেছিল। অর্থের দাপটে রাতারাতি নিজেকে বিশাল নেতা হিসেবে জাহির করা এবং বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ করে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা ছিল তার এক সুদূরপ্রসারী কৌশল। এই কৌশলের নেপথ্যে কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা ইসমাইল হোসেন। এই রাজনৈতিক ও অপরাধী সিন্ডিকেট কেবল ঢাকাতেই নয়, বরং বেলাবো ও ভৈরবের মতো এলাকাগুলোতেও তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। খোকন মাহমুদ নির্ঝর নিজেকে ঢাকার রাজপথের ত্রাস হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন, যা মূলত ছিল পেশিশক্তি ও অস্ত্রের আস্ফালনের এক কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ। একজন রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় যেখানে হওয়ার কথা ছিল জনগণের সেবক, সেখানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক।
নির্ঝরের সম্পদের পাহাড় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর বিস্তার বেলাবোর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে ঢাকার অতি অভিজাত এলাকা পর্যন্ত। নিজের গ্রামে ৩ কোটি টাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি থেকে শুরু করে বারৈচা বাজারে কোটি কোটি টাকার বহুতল ভবন—এই সবই কি কেবল ব্যাগ ব্যবসার আয়ের ফসল? উত্তরটি সবারই জানা। বেলাবো বাজারে নিজের ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচালিত বিশাল সিমেন্ট ব্যবসা, রাস্তার পাশে শত কোটি টাকার জমি দখল এবং ঢাকার ধানমন্ডিতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট—এই বিশাল সাম্রাজ্য মূলত টেন্ডারবাজি, চাদাবাজি এবং ব্ল্যাকমেইলের ইটের ওপর নির্মিত। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ ভবনের মতো স্পর্শকাতর এলাকার সামনে ‘এইচবি কার শো-রুম’ পরিচালনা করা এবং তার আড়ালে কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত চতুর ও সুপরিকল্পিত। এটি আমাদের আর্থিক ও গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে।
খোকন মাহমুদ নির্ঝরের অপরাধ জগতের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো তার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের কৌশল। তিনি নিজে কোনো বড় ঠিকাদার না হয়েও অস্ত্রের মুখে কাজ ছিনিয়ে নিয়ে অন্য প্রকৃত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে কমিশনের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়ার যে সংস্কৃতি চালু করেছিলেন, তা আমাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য এক বিশাল হুমকিস্বরূপ। এর ফলে যেমন কাজের মান নিম্নগামী হয়েছে, তেমনি সৎ ও যোগ্য ঠিকাদাররা বাজার থেকে ছিটকে পড়েছেন। তার এই সিন্ডিকেট পরিচালনার জন্য তিনি যে বিশাল ক্যাডার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারা কেবল টেন্ডার নয়, বরং অপহরণ ও ব্ল্যাকমেইলের মতো জঘন্য কাজেও লিপ্ত ছিল। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ যখন এমন একজন ব্যক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্র ও প্রশাসনের নীরবতা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে।
৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর নির্ঝরের দেশত্যাগ এবং বিদেশে পাড়ি জমানোর ঘটনাটি আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। বিপদের আঁচ পেয়ে কোটি কোটি টাকার জমি দ্রুত বিক্রি করে দুবাই পালিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, এই অপরাধীরা সবসময়ই তাদের পালানোর পথ খোলা রাখে। তবে দেশ ত্যাগ করলেই কি অপরাধের দায়ভার মুছে যায়? খোকন মাহমুদ নির্ঝরের মতো যারা দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে বিলাসী জীবন যাপন করছেন, তাদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা এবং কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা এখন সময়ের দাবি। কেবল তাকে শাস্তি দিলেই চলবে না, বরং তার এই বিশাল অবৈধ সম্পদ রাষ্ট্রীয় অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং এই সম্পদ অর্জনে যারা তাকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করেছেন, তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, খোকন মাহমুদ নির্ঝর কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি ব্যবস্থার ফসল। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক ‘নির্ঝর’ তৈরি হবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের ঘর পরিষ্কার করা এবং অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করা। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোনো ব্যাগ বিক্রেতা বা সাধারণ কর্মী কয়েক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে। বেলাবোর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সারা দেশের নাগরিক সমাজ আজ এই অন্যায়ের প্রতিকার চায়। খোকন মাহমুদ নির্ঝরের এই লুণ্ঠনের মহাকাব্যের অবসান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই এখন রাষ্ট্র ও বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।