বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্দরমহলে জেঁকে বসা এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট ও প্রশাসনিক মাফিয়াতন্ত্রের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছেন মেক্সিকোতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী। সদ্য বিদায়ী পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নগ্ন স্বেচ্ছাচারিতা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার যে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে, তাতে স্তম্ভিত পুরো কূটনৈতিক পাড়া। গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনসারীর এই বিস্ফোরক তথ্য ফাঁসের পর এটা স্পষ্ট যে, তৌহিদ হোসেন উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে নিজের ব্যক্তিগত ইগো এবং সংকীর্ণ আখের গোছাতে গিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব মিশনকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছিলেন। তৌহিদ হোসেনের এই 'অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হাইজ্যাকিং' বা প্রশাসনিক দস্যুতার ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনাগুলো কেবল অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়নি, বরং দেশের ভাবমূর্তিও ধুলোয় মিশেছে।
অভিযোগের মূল তীর তৌহিদ হোসেনের সেই অদৃশ্য সুতোর টানের দিকে, যা দিয়ে তিনি রাষ্ট্রদূতদের হাত-পা বেঁধে রাখতেন। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক জয়জয়কার ঠেকাতে তৌহিদ হোসেনের দপ্তর থেকে পরিকল্পিতভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো। একজন দক্ষ পেশাদার হিসেবে মুশফিকুল ফজল আনসারী যখনই দেশের স্বার্থে কোনো সাহসী উদ্যোগ নিতে চেয়েছেন, তখনই তৌহিদ হোসেনের ইশারায় মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল আটকে দেওয়া বা প্রশাসনিক অসহযোগিতার চরম সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এটি কেবল কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, বরং তৌহিদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের অংশ, যারা চায়নি বাংলাদেশের নতুন সূর্য বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল হোক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তৌহিদ হোসেনের এই শত্রুতার মূলে ছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ বাণিজ্য ও পদায়ন নিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের নেশা। তিনি মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী চেয়ারে বসে নিজের একদল অন্ধ অনুগত কর্মকর্তাকে বিদেশে লাভজনক মিশনে বসাতে মরিয়া ছিলেন। কিন্তু আনসারীর মতো স্পষ্টবাদী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি তাঁর সেই অপকর্মে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি রাষ্ট্রদূত আনসারীর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছেন। মেক্সিকোর মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও লজিস্টিক সাপোর্ট বন্ধ করে দিয়ে তিনি কার্যত রাষ্ট্রদ্রোহিতার সমতুল্য কাজ করেছেন। তৌহিদ হোসেনের এই সংকীর্ণ মানসিকতার মাশুল আজ পুরো জাতিকে দিতে হচ্ছে।
তৌহিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। মন্ত্রণালয়ের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিনিধি নির্বাচন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে—সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো তৌহিদ হোসেনের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন এক নতুন উচ্চতায় যাওয়ার কথা, তখন তৌহিদ হোসেনের অদৃশ্য দেয়াল তোলার প্রচেষ্টা অনেক প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। তিনি কি কোনো বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, নাকি নিজের কুৎসিত ইগো চরিতার্থ করতে রাষ্ট্রকে বলি দিয়েছেন, সেই প্রশ্ন এখন প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের মুখে মুখে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তৌহিদ হোসেনের এই কর্মকাণ্ড ছিল মূলত একটি 'শ্যাডো এজেন্ডা'র অংশ। তিনি জানতেন মুশফিকুল ফজল আনসারী কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবেন না, তাই তাঁকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করে রাখার সব ধরণের নোংরা কৌশল তিনি অবলম্বন করেছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার বা উচ্চপর্যায়ের সংলাপ থেকে রাষ্ট্রদূতের নাম কেটে দেওয়া কিংবা শেষ মুহূর্তে সরকারি আদেশ বাতিল করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনাও ঘটিয়েছেন এই উপদেষ্টা। একজন পেশাদার কূটনীতিকের কাজে এভাবে বাধা দিয়ে তৌহিদ হোসেন প্রমাণ করেছেন যে, তিনি রাষ্ট্রের সেবকের চেয়ে নিজের বলয়ের গডফাদার হিসেবে থাকতেই বেশি পছন্দ করতেন।
তৌহিদ হোসেনের বিদায়ের পর এখন দাবি উঠেছে তাঁর আমলের প্রতিটি ফাইল ও সিদ্ধান্তের বিচার বিভাগীয় তদন্তের। তিনি কেন এবং কার ইশারায় একজন সফল রাষ্ট্রদূতের ডানা ছেঁটে দিতে চেয়েছিলেন, তার নেপথ্য কারণ উদঘাটন করা জরুরি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন এবং তৌহিদ হোসেনের আমলে হওয়া বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে। এই মাফিয়া চক্রের মূল উপড়ে না ফেললে প্রশাসনের সংস্কার কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তৌহিদ হোসেনের মতো ব্যক্তিদের জন্য কোনো ছাড় নয়, বরং তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি।
তাছাড়া তৌহিদ হোসেন বনাম মুশফিকুল ফজল আনসারী এই দ্বন্ধটি প্রশাসনের পচনশীল অবস্থাকেই তুলে ধরেছে। একজন উপদেষ্টা যখন রাষ্ট্রের স্বার্থকে নিজের পায়ের নিচে মাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেন না, তখন বুঝতে হবে বিপদ কত আসন্ন। রাষ্ট্রদূত আনসারী যে সাহসিকতার সাথে এই সত্য উন্মোচন করেছেন, তা দেশের প্রতিটি দপ্তরে ঘাপটি মেরে থাকা তৌহিদ হোসেনদের জন্য একটি কড়া সতর্কবার্তা। এখন সময় এসেছে এই প্রশাসনিক আবর্জনা পরিষ্কার করার, অন্যথায় বাংলাদেশের কূটনীতি বিশ্বমঞ্চে বারবার এমন অপশক্তির হাতে লাঞ্ছিত হবে।