নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুই প্রভাবশালী মুখ্য সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এবং ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন অভিযোগ সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গোপন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, তারা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিশ্বের চারটি প্রধান দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। গত ১৬ মাস ধরে অত্যন্ত গোপনে এবং পরিকল্পিতভাবে এই অর্থ সংগ্রহের কাজ চলেছে। এই পাচার প্রক্রিয়ায় কেবল তারা দুজনই নন, বরং তাদের পরিবারের সদস্য এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত কিছু ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কীভাবে জনগনের আমানত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তার এক ভয়াবহ চিত্র এই প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পাচারকৃত এই ১১ হাজার কোটি টাকার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরকে। মরুভূমির এই ঝকঝকে শহরে আসিফ মাহমুদ এবং আসিফ নজরুল যৌথভাবে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। দুবাইয়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত 'পাম জুমেইরাহ' এবং 'বিজনেস বে' এলাকায় তারা একাধিক বিলাসবহুল ভিলা ও বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোনো ব্যাংকিং চ্যানেলে নয়, বরং অবৈধ হুন্ডি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কয়েক দফায় দুবাইতে পাঠানো হয়েছে। সেখানে তারা কেবল আবাসন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং আসিফ নজরুলের এক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের নামে একটি আন্তর্জাতিক মানের ল ফার্ম বা আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এছাড়া আসিফ মাহমুদ সেখানে গোল্ডেন ভিসা সুবিধা গ্রহণ করে একটি বিশাল রিয়েল এস্টেট কোম্পানির মালিকানা অর্জন করেছেন, যা মূলত পাচারকৃত অর্থ সাদা করার একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরকে এই সিন্ডিকেট তাদের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের স্বর্গরাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। সেখানে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা পাচার করার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। সিঙ্গাপুরের অভিজাত মাউন্ট এলিজাবেথ এলাকা এবং মেরিনা বে সংলগ্ন অঞ্চলে দুটি বড় ট্রেডিং কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ার কিনেছেন এই দুই সাবেক উপদেষ্টা। এই বিনিয়োগের পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থের উৎস গোপন করা। সিঙ্গাপুরের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, এই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া এলসি বা আমদানির আড়ালে বাংলাদেশ থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কেনাকাটার কমিশনগুলো সরাসরি সিঙ্গাপুরের এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে জমা হতো। এটি ছিল তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার একটি অংশ যাতে দেশে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও বিদেশের এই সম্পদ তাদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি এবং মেলবোর্নে এই সিন্ডিকেটের বিনিয়োগের ধরন ছিল ভিন্ন। সেখানে মূলত আসিফ মাহমুদের পরিবারের সদস্যদের নামে আবাসন ও হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, সিডনির অভিজাত এলাকায় একাধিক বাড়ির মালিকানা এখন আসিফ মাহমুদের পরিবারের হাতে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ পাচারের জন্য অত্যন্ত সুক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে যাতে অস্ট্রেলিয়ার কঠোর কর ফাঁকি বিরোধী আইন এড়িয়ে যাওয়া যায়। সেখানে বড় বড় হোটেল চেইনে বেনামে বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রবাসীদের ব্যবসায় পার্টনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আসিফ মাহমুদের আত্মীয়-স্বজনরা সরাসরি তদারকি করেছেন এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে তাদের স্থায়ী আবাস বা 'সেকেন্ড হোম' নিশ্চিত করেছেন।
ইউরোপের দেশ সুইজারল্যান্ড বরাবরই কালো টাকা জমানোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এই দুই উপদেষ্টাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। জুরিখভিত্তিক একটি নামকরা ব্যাংকে শেল কোম্পানির নামে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা জমা রাখার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এই শেল কোম্পানিগুলো মূলত অফশোর আইল্যান্ডগুলোতে নিবন্ধিত, যার প্রকৃত মালিকানার সুতা লুকিয়ে আছে আসিফ মাহমুদ ও আসিফ নজরুলের হাতে। এই অ্যাকাউন্টে সরাসরি কোনো লেনদেন করা হতো না, বরং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অর্থ সেখানে জমা হতো। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, এই অর্থ মূলত মেগা প্রজেক্টগুলোর বিদেশি ঠিকাদারদের কাছ থেকে নেওয়া ঘুষ বা পার্সেন্টেজ যা সরাসরি বিদেশি মুদ্রায় সেখানে জমা করা হয়েছে। ফলে দেশে এই অর্থের কোনো অস্তিত্ব বা রেকর্ড নেই।
এই বিশাল অর্থ সংগ্রহের জন্য তারা প্রশাসনের ভেতরে একটি নিশ্ছিদ্র সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের মাঠ পর্যায়ের মূল নায়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং তার একান্ত সচিব বা এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন। তারা মূলত সমন্বয়কের কাজ করতেন। গত ১৬ মাসে সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নিয়োগ, বদলি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে তারা একটি নির্দিষ্ট রেট চার্ট তৈরি করেছিলেন। যে কোনো বড় পদে আসীন হতে হলে বা সুবিধাজনক স্থানে বদলি পেতে হলে এই সিন্ডিকেটকে কোটি কোটি টাকা দিতে হতো। এছাড়া সরকারি মেগা প্রজেক্টগুলোর কেনাকাটায় ঠিকাদারদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে কমিশন আদায় করা হতো। যারা এই কমিশন দিতে অস্বীকার করত, তাদের কার্যাদেশ বাতিল বা নানাভাবে হয়রানি করা হতো। এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি হুন্ডি ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো যারা তা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিত।
প্রশাসনিক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদ এবং আসিফ নজরুল তাদের পদমর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাই এই সিন্ডিকেটের ভয়ে নীরব ছিলেন। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে আসিফ মাহমুদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে আসিফ নজরুল তার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন আইনি জটিলতা নিরসনের নামে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে অবৈধ সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের এই কর্মকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে। ১১ হাজার কোটি টাকা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিশাল অংকের মূলধন, যা পাচার হয়ে যাওয়ায় দেশের ডলার সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের এই পূর্ণাঙ্গ চিত্র যখন জনসম্মুখে এসেছে, তখন তা সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছেন যে, যারা পরিবর্তনের ডাক দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারাই যদি এমন লুণ্ঠনে মেতে ওঠেন তবে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গোয়েন্দা শাখা এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ করে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হয় এবং পাচারকৃত সম্পদ জব্দ করা না যায়, তবে এটি দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই অপরাধের সাথে জড়িত প্রত্যেকের বিচার এবং অর্থ উদ্ধারই এখন সময়ের দাবি।